সীমান্ত গান্ধী নামে কে পরিচিত এবং কেন? বিষদ জানুন


সীমান্ত গান্ধী কে ছিলেন :- যে গান্ধীকে আমরা প্রায় লোকই জানি না। সীমান্ত গান্ধী ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুগামী। মুসলমান প্রধান অঞ্চলে জননীত হওয়া সত্বেও তিনি অসাম্প্রদায়িক অনুভবের পরিচয় দিয়ে ছিলেন। যখন ইংরেজের কুচক্রে ভারতকে দুখন্ডিত করা হয় তখন তিনি আন্তরিক ভাবে ব্যাথা পেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন,” আমাকে একদল বাঙরের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” উনার ইচ্ছে ছিলো ভারত এবং পাকিস্তান যেনো ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে উঠে।

এরজন্য তিনি স্বাধীন পাকিস্তানেও আন্দোলন করেছিলেন, তখন তাঁকে নানা ভাবে নিপীড়িত করা হয়, এমনকি কারাবাসের দুর্ভাগ্যও ভোগ করতে হয়েছিল। তবুও কখনো মিথ্যার আশ্রয় তিনি নেননি। লৌহ কোটি অনুভবের অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন ‘আব্দুল গাফফার খান’ যাকে সীমান্ত গান্ধী নামে জানা যায়।


জন্ম ও কিশোরকাল:- আফগানিস্তান এর সীমান্তবর্তী উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের এক নিষ্ঠাবান সুন্নি পরিবারে আব্দুল গাফফার খানের জন্ম হয়েছিল। ছুটো থেকেই তার মধ্যে কয়েকটি গুনের বিকাশ পরিলক্ষিত হয়।

তিনি ছিলেন সৎ, সত্যবাদী এবং আদর্শবান মনের মানুষ। কখনো তিনি মিথ্যার আশ্রয় বহন করেননি। ছুটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে ছিল তার অপরিসীম কৌতূহল। কার্যকরন জানতে ইচ্ছুক ছিলেন। সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় রেখেছিলেন তিনি বিভিন্ন কাজে, একাধিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি।

এর পাশাপাশি তিনি বালক সুলুভ খেলা-ধূলা তেও অংশ গ্রহণ করতেন তিনি। কিশোর আব্দুল গাফফার খানের জীবনে বিরাট বড় পরিবর্তন আসে। তিনি হয়ে উঠলেন ভাবুক প্রকৃতির মানুষ, তখন তাঁর ছেলে মানুষী খেলা-ধূলা ভালো লাগতো না।

তিনি একা একা বসে কি যেনো চিন্তা করতেন। এই সময় তিনি একদল কিশোরকে নিয়ে দান সেবামূলক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। যে অঞ্চলে আব্দুল গাফফার খানের জন্ম হয়েছিল সেই এলাকার বেশির ভাগ মানুষই ছিল দরিদ্রতার আঘাতে নিষ্কশিত, দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটে না।

প্রকৃতিও সেখানে বড়ই নিষ্টুর, সেখানে প্রকৃতি তাদের ফসল দে না। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সামান্য যা কিছু ফসল উৎপন্ন হতো, তাও মালিক পক্ষরা শোষণ করে নিত। আব্দুল গাফফার খান এই সামাজিক অন্যায় এর বিরুদ্ধে রুখে দারাবার চেষ্টা করেছিলেন। বাড়ি থেকেও তিনি পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন এবং পাড়ার লোকেরাও তাকে অনেক স্নেহ করতেন। এইভাবেই ভবিষ্যতের এক মহান নেতার কিশরকাল শেষ হয়ে গেলো।


সীমান্ত গান্ধীর কর্ম জীবন:- তিনি যখন পাঠান হাইস্কুলের লেখা পড়া শেষ করেন, তখন তিনি ইংরেজ সরকারের অধীনে ইংরেজ সরকারের অধিনস্থ পশ্তুন বাহিনীতে যোগদানের প্রস্তাব পান। কিন্তু তিনি এটাতে যাননি কারণ তিনি ভালো ভাবেই জানতেন যে যদি ব্রিটিশদের অধীনে থাকা চাকরিতে যোগ দেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারবেন না। যার ফলে উনি আর এটাতে যোগ দেন না।

এরপর তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ব বিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি কৃষি কাজ দেখভাল করতে লাগলেন।


এরপর তিনি 1911 সালে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন। 1911 সালে আব্দুল গাফফার খান পশ্তুনের স্বাধীনতা সংগ্রামী তুরঙ্গ জই এর হাজী সাহেবের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যোগদান করেন। যখন সারা বিশ্বে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলছে ঐসময় তিনি পাঠানদের জাগ্রত করার জন্যে, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য তিনি 500 এর অধিক গ্রাম পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান, যার ফলে তাকে ‘ বাদশাহ খান ‘ নামে ভূষিত হন।

উনি খিলাফত আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপর তিনি 1920 এর দশকে ‘ খুদাই খিদমতগার ‘ নামক সংগঠন প্রতিষ্টা করেছিলেন। যাকে ‘Red shirt’ নামেও অভিহিত করা হয়। 1929 সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘ খুদাই খিদমতগার ‘ আন্দোলনে আব্দুল গাফফার খান সফলতা লাভ করেন।


আব্দুল গাফফার খানকে ভারতে সীমান্ত গান্ধী বলা হয় কেনো:- 1930 সালে গান্ধীজি শুরু করেছিলেন আইন অমান্য আন্দোলন। গান্ধীজি যখন আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করেন তখন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমী সীমান্তে গান্ধীজির আদর্শ অনুসরণ করে অহিংস ভাবে আইন আন্দোলনে করছিলেন খান আব্দুল গাফফার।

গান্ধীজি আইন অমান্য আন্দোলন করেছিলেন এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্তে আব্দুল গাফফার খান গান্ধীজিকে অনুসরণ করে আন্দোলন করেছিলেন , এর ফলে তার নাম হয় সীমান্ত গান্ধী।


আব্দুল গাফফার খান এর রাজনৈতিকজীবন:- ভারতবর্ষের রাজনৈতিক নীতিতে মহাত্মা গান্ধী এক দিলীপ কুমার সূর্যের মত বিরাজ করছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারী পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তার জন প্রিয়তা। যৌবনের প্রথম লগ্নে আব্দুল গাফফার খান মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক ভাবাদর্শে মুগ্ধ হলেন এবং তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

জীবনে চলার পথে কখনো তিনি পথভ্রষ্ট হননি, কখনো তিনি গান্ধীজির প্রদর্শিত নীতির বিরোধিতা করেননি, এমনকি গান্ধীজিকে মাঝে মাঝে কিছু কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। এরপরে দেশবাসী যখন তার প্রতি বিরোধ করেছে, তাকে ইংরেজের গুলাম বলেও অভিহিত করেছে, তখনও আব্দুল গাফফার খান এসব অপপ্রচারে কিন্তু মাত্র বিভ্রান্ত হননি। জীবনের শেষ বিন্দু রক্ত দিয়েও তিনি গান্ধীজির আদর্শ প্রতিষ্টা করতে চেয়েছেন।


আব্দুল গাফফার খান যখন দেখলেন যে মুসলিম লীগের উদয় হয়েছে এবং খুব তাড়াতাড়িই মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তখন গভীর ব্যাথা নিয়ে তিনি এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। কেননা তিনি চাননি যে হিন্দু মুসমান কখনোই দুটি জাতি না, তারা ভারত মায়ের সন্তান হিসাবে থাকবে।

তিনি বলেছিলেন যে ধর্মকে ভিত্তি করে কখনো যেনো ভারত বিভাজিত না হয় এমন হলে তিনি সর্ব প্রথম বাধা দিতেন। শেষ পর্যন্ত ভারত বিভাজিত হলো এবং পাকিস্তান নামের আরেক নতুন রাষ্ট্রের আবিষ্কার হয়। আব্দুল গাফফার খানের প্রাণপণ প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় তিনি আন্তরিক ভাবে ভেঙে পড়ে ছিলেন।

মুসলিম লীগের অনমনীয় মনোভাবের ফলে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান চোখে পড়ে। যে ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু মুসলমানরা সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল, সেখানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তখন আব্দুল গাফফার খান রাজনৈতিক জীবন থেকে সেচ্ছা নির্বাচন নিলেন। তিনি তার গ্রামে ফিরে গেলেন।

সেখানকার শান্ত বাতাবরণে তিনি জীবন কাটাতে লাগলেন। এর আগে গান্ধীজির প্রতিটি আন্দোলনে তিনি যুগ দিয়েছিলেন।1942 সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির নেতা। লবণ আন্দোলন, ডান্ডি অভিযান, সকল ক্ষেত্রে তিনি এইসব সত্যাগ্রহীদের সঙ্গে আন্দোলন করেছিলেন উত্তর পশ্চিম সীমান্তে যে অস্প্রদায়িকতা রচিত হয় তার অন্তরালে ছিলেন এই মহান নেতা।

এই মহান অসাম্প্রদায়িক নেতার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে ইংরেজদের কারাবাসে। এমনকি মুসলিম লীগ সরকার ও তাকে বিপদজনক ব্যাক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল। তখন তিনি অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

1987 সালে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে আব্দুল গাফফার খান এদেশে এসেছিলেন। তখন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তার হাতে সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এর পরের বছরেই 1988 সালে আব্দুল গাফফার খান এর মৃত্যু হয়ে যায়।

আশাকরি আমরা সীমান্ত গান্ধী নামে কে পরিচিত, উনার সবিস্তার প্রমাণ পেলাম। এইরকম আরও শিক্ষণীয় বিষয় জানতে হলে আমাদের পোর্টালে নিয়মিত নতুন নতুন আর্টিকেল পড়তে পারবেন। অন্যান্য আর্টিকেল পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com