সনাতন শব্দের অর্থ কি?


সনাতন শব্দের অর্থ, সনাতন ধর্মের প্রবর্তক এবং অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে সনাতন ধর্মের প্রার্থক্য
সনাতন শব্দের অর্থ:- সনাতন শব্দের অর্থ হলো শ্বাসত বা চিরন্তন। শ্বাসত বা চিরন্তন এর অর্থ হলো যা আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

সনাতন শব্দের অর্থ কি

যেমন :- পৃথিবী সূর্যের চারিকে ঘুরে, আগেও পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরতো, এখনও ঘুরছে আর ভবিষ্যতেও ঘুরবে। কেননা পৃথিবীর ধর্ম হলো সূর্যের চারিদিকে ঘোরা, এই ধর্ম যদি পৃথিবী লঙ্ঘন করে তাহলে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড উলট পালট হয়ে যাবে। এই ধর্ম কেউ নিজে বানায়নি, এটা প্রকৃতি সৃষ্ট ধর্ম এবং এই প্রকৃতি সৃষ্ট ধর্মই হলো সনাতন ধর্ম

সনাতন ধর্মের অর্থ কী? সনাতন ধর্ম কাকে বলে?

ধর্ম শব্দটি আসে সংস্কৃত ধৃ- ধাতু থেকে। যার হলো ধারণ করা। একজন ব্যাক্তি তার জীবনে যত প্রকারের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন তা সব মিলিয়ে হয় তার ধর্ম। তার বিশ্বাস, তার আচার গত ব্যবহার, তার পরম্পরাগত শিক্ষা এই সবই হলো তার ধর্ম। যেভাবে আগুনের ধর্ম দহনকার্য, জলের ধর্ম শীতলতা, পশুর ধর্ম পশুত্ব এবং মানুষের একমাত্র ধর্ম হলো মনুষ্যত্ব। এবং এই মনুষ্যত্বই আজও এই সমাজকে ধরে রেখেছে।

মহাভারত বলচ্ছে, ” ধারণাত্ ধর্মো ধারয়তি প্রজাঃ।
যঃ স্যাত্ ধারণসংযুক্তঃস ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।।
অর্থাৎ যা এই সমাজকে, প্রজা সাধারণকে ধারণ করে রাখে তা- ই ধর্ম। এটা এমন এক সদাচার যা ধারণ করলে সমাজ ব্যাবস্থা ঠিক থাকে, আত্মার উন্নতি ও প্রাপ্তির পথ সুগম হয়। যে গুনগুলির জন্যে সমাজের জন্য নিজের বা অন্যের এবং সমাজের তথা দেশের বা দশের ক্ষতি হয়, সেই গুণগুলোকে অধর্ম বলি।

মানুষ একমাত্র সৎ পথেই নিজের এবং সমাজের উপকার করতে পারে কারণ অসৎ পথে নিজের কিছুটা উপকার করলেও অন্যের কিন্তু ক্ষতি হবে। তাই অসৎঅতাই অধর্ম এবং মানবতা, সত্যনিষ্টা, এবং সদাচারী হলো ধর্ম।

অন্যান্য ধর্ম এবং সনাতন ধর্মের মধ্যের মধ্যে থাকা প্রার্থক্য

ধর্ম আসলে একটাই আর এটা হলো সনাতন ধর্ম। সনাতন ধর্ম হলো প্রকৃতির ধর্ম, ঈশ্বর সৃষ্ট ধর্ম। অন্যান্য ধর্ম যেমন, বুদ্ধ ধর্ম, শিখ ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম এইগুলোকে যদিও আমরা ধর্ম বলে থাকি, আসলে কিন্তু এগুলো হচ্ছে মতবাদ। কেননা এই ধর্মগুলোর প্রবর্তক রয়েছে এবং তাদের একটি নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থও রয়েছে।

ধর্মের কোনো প্রবর্তক হয় না, প্রবর্তক হয় মতবাদের। তাই যেগুলোকে আমরা ধর্ম বলে থাকি , সেগুলো হলো মতবাদ। যাকে সৃষ্টি করা হয় বা যাকে প্রবর্তন করা হয়, তাকে রিলিজিয়ন বা মতবাদ। যা সৃষ্টির আদী থেকে প্রলয়েরও পরে বিদ্যমান থাকে, তাকে ধর্ম বলে।

যেমন :- আগুনের ধর্ম দহন করা, যেদিন আগুন দহন কার্য বন্ধ করে দেবে, সেদিন তাকে আর আগুন বলা যাবে না। ঠিক তেমনি যেদিন মানুষ মনুষ্যত্বকে ত্যাগ করবে সেদিন তাকে আর মানুষ থাকবে না। একটি মানুষ অনায়াসে তার রিলিজিয়নকে ত্যাগ করতে পারবে কিন্তু যদি মানবতা ধর্ম ত্যাগ করতে চায়, তবে তাকে আর মানুষই বলা যাবে না।

তাই ধর্ম একটাই। সেটা হলো সনাতন ধর্ম। কেননা সনাতন ধর্ম মানুষকে প্রথমে মানুষ হতে শেখায়। তারপর তার নিজস্ব বিশ্বাসের উপর গুরুত্ব দিতে শেখায়।

একজন মানুষকে মানুষ হতে গেলে কি কি ধর্মীয় গুণ ধারণ করতে হয়:-

“ধৃতিঃ ক্ষমা দম অস্তেয় শৌচং ইন্দ্রিয়নিগৃহ ধীঃ বিদ্যা সত্যম্ অক্রোধ” এই গুণগুলোর মাধ্যমেই মানুষ নিজের ও সমাজের উন্নতি করতে পারে। আবার কোনো ব্যাক্তি যদি আত্ম উন্নতি করতে চান বা সাধনায় মনোনিবেশ করতে চান, তাহলেও এই দশটি গুন তাকে ধারণ করে তাকে মোক্ষ লাভ করতে হবে।

এই দশটি গুণগুলো হলো :-
১/ মানুষের প্রথম ধর্ম হলো ধৃতি বা ধৈর্য্য, প্রতিটা কাজে, প্রতিটা ক্ষেত্রে ধৈর্য্যই মানুষকে সফলতা এনে দিতে পারে। যার ধৈর্য্য নেই, সে কার্যে ব্যার্থ হয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তাই মানুষের প্রথম ধর্ম হলো ধৈর্য্য।


২/ দ্বিতীয় ধর্ম হলো ক্ষমা। ক্ষমা হলো মানুষের সেই গুণ যার থেকে মানুষ প্রতি হিংসা বা নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা থেকে মুক্তি লাভ করে। তার মানে এই নয় যে, যে বার বার ভুল করে আসছে আর তাকে বার বার ক্ষমা করে দেওয়া। ক্ষমা মানুষের অন্যতম গুণ ঠিকই কিন্তু ক্ষমার অযোগ্যকে ক্ষমা করা ঠিক নয়। কারণ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া মানে অন্যায়কারীর থেকে দ্বিগুণ অপরাধ করা। তাই অন্যায়কে ক্ষমা না করে বিনাশ করা কর্তব্য।


৩/ তৃতীয় ধর্ম হলো দম বা স্বধর্মে অবিচলতা। দম শব্দের অর্থ হলো সদা, সর্বদাই, নিজের কর্মে অবিচল রাখা। অর্থাৎ শত্রুকে ক্ষমা করো ঠিকই কিন্তু যদি সেই শত্রু তোমায় ক্ষমার সুযোগ নিয়ে দেশের, দশের বা সমাজের ক্ষতি করে, তাহলে তাকে বিনাশ করাই তোমার ধর্ম। এক কথায় বলতে গেলে সর্বক্ষেত্রে ধর্মের পথে থাকা, এবং কর্তব্যগুলো সঠিক ভাবে পালন করাই হলো দম। অর্থাৎ যেকোনো পরিস্থিতিতে ধর্মকে রক্ষা করাই হলো দম।


৪/ চতুর্থ ধর্ম হলো অস্তেও বা চুরি না করা। অর্থাৎ বিনা অনুমতিতে কারোর কিছুতে হাত না দেওয়া হলো অস্তেও।


৫/ পঞ্চম ধর্ম শৌচ বা শুচিতা। অর্থাৎ সদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, অখাদ্য খাবার গ্রহণ না করা। একই ভাবে মনের দিক থেকেও শুচিতা রাখা।


৬/ ষষ্ঠ ধর্ম হলো ইন্দ্রিয়নিগ্রহ বা ইন্দ্রিয় জয় করা। অর্থাৎ লোভে মত্ত হয়ে অন্যের ক্ষতি না করা এবং লালসা চরিতার্ত করার জন্যে নারীগণের ক্ষতি না করা।


৭/ সপ্তম ধর্ম হলো ধী বা বুদ্ধি। কি থেকে আমাদের সমাজের ক্ষতি হবে আর কি থেকে আমাদের সমাজের ক্ষতি হবে না, তা নির্ণয় করে কর্ম করে যাওয়ার নাম হলো ধী বা বুদ্ধি।


৮/ অষ্টম ধর্ম হলো বিদ্যা বা যথার্থ শিক্ষা। প্রাণী জগতের প্রত্যেকেই বিদ্যা শেখে বা বিদ্যা লাভ করে কিন্তু একমাত্র মানুষই আছে বিদ্যা শেখায় বা সমাজের উন্নতির জন্যে বিদ্যা লাভ করে। যে বিদ্যা মানুষের ভালো কাজে লাগবে সেই বিদ্যা শেখা উচিত। যেমন, টেরিরিস্টরাও বিদ্যা শেখে কিন্তু এই বিদ্যা সমাজের ক্ষতি করে, তাই এইসব বিদ্যা শেখ উচিত নয়।


৯/ সত্য বা সত্য ধারণ। সর্বদা সত্য বলা, সত্যের পথে চলা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, মানব ধর্মের অন্যতম আরেক গুণ।


১০/ মানুষের সর্ব শেষ ধর্ম বা সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম হলো অক্রোধ বা রাগ না করা। রাগ মানুষের বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। রাগ মানুষকে অসৎ পথে চলতে এবং ধর্মকে লঙ্ঘন করতে বাধ্য করে। রাগ সর্বক্ষেত্রেই পতনের কারণ। তাই রাগ ত্যাগ করা উচিত।

আপনি কি জানেন সনাতন ধর্মের প্রবর্তক বা প্রতিষ্ঠাতা কে?

আমরা সনাতনী কিন্তু আমাদের যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে আমাদের প্রবর্তক কে, তাহলে আমরা সবাই ততমত খেয়ে অনেকে অনেক ধরনের উত্তর করে থাকি। তাই আমরা আমাদের সনাতন ধর্মের প্রবর্তকএর বিষয়ে ভালোভাবে জ্ঞান লাভ করা এবং সনাতন ধর্মের প্রবর্তক এর বিষয়ে জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে করে কেউ সনাতন ধর্মের প্রবর্তক এর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে ততমতো না খেয়ে ঝটপট উত্তর দিতে পারি।


ধর্ম মানে হলো বৈশিষ্ট্য বা গুণ। ঈশ্বর যখন এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তখন পৃথিবীতে থাকা সব কিছুর এক নিদৃষ্ট ধর্ম বা বৈশিষ্ট দিয়েছেন। যেমন জলের ধর্ম নিম্নগামী হওয়া, লোহার ধর্ম কাঠিন্য, এই ধর্মগুলোকে কোনো মানুষ বদলাতে পারবে না। কেননা এগুলো হলো প্রকৃতির ধর্ম। মানুষও এভাবে কিছু জৈবিক ধর্ম নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছে, তা হলো মানুষের জন্মের পর ক্ষুধা পায়, বেচেঁ থাকার চেষ্টা করে।

তবে মানুষের জৈবিক ধর্ম ছাড়াও রয়েছে কিছু মানব ধর্ম। যা মানুষকে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী থেকে অনেক বুদ্ধি সম্পন্ন করে রেখেছে। কিন্তু এই ধর্ম মানুষ সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হয়নি। মানুষের দেহের আকার সৃষ্টি হওয়ার অনেক পরে সৃষ্টি হয়েছে এই মানব ধর্মের।


প্রাচীন কালে আর্য সভ্যতা সৃষ্টি করেছে এই ধর্মের। প্রাচীন কালে উন্নত মস্তিস্ক সম্পন্ন ভগবান রুপী মুনি ঋষিরা মানব ধর্মের সৃষ্টি করেন। তারা প্রকৃতি থেকে যা কিছু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, তা থেকেই সৃষ্টি হয় মানব ধর্মের। মানুষ জন্মের সাথে সাথেই ধর্ম প্রাপ্ত হয় প্রকৃতি থেকেই।

আপনি কি জানেন মানুষ যা সৃষ্টি করে তা হলো মথ বা পথ, অন্যতায় প্রকৃতি যা সৃষ্টি করে তা হলো ধর্ম। মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের উন্মেষ ঘটার সাথে সাথেই তার জন্য নির্ধারিত ধর্ম প্রাপ্ত হয়েছে প্রকৃতি থেকেই । তাহলে বলা চলে সনাতন ধর্মের প্রবর্তক কেউ নেই, সনাতন ধর্মের প্রবর্তক প্রকৃতি নিজেই।

এই আর্টিকেলে আপনারা পড়েছেন যে, সনাতন ধর্মের অর্থ কী? সনাতন ধর্ম কাকে বলে? এইরূপ আরও অজানা তথ্য এই সাইটে নিয়ে আসবো। এছাড়া আরও অন্যান্য তথ্য জানতে হলে এখানে ক্লিক করুন।


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com