সংসার শব্দের অর্থ কি


অনেকে প্রশ্ন করেন যে, সংসার শব্দের অর্থ কি ? সংসার একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ হলো বিশ্ব। সংসারকে জীবন চক্র বলেও জানা যায়। আমরা সকলেই প্রায় পুনর্জন্ম শব্দটি শুনে থাকি, এই পৃথিবীতে আবার জন্ম নেওয়াকেই পুনর্জন্ম বলা হয়।এই পুনর্জন্ম সংসারের একটি ধারণা যা চিরন্তন সত্য।

সংসার শব্দের অর্থ কি

আমাদের ভারতীয় ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস যে আমাদের সকলেরই পৃথিবীতে পুনর্জন্ম হয়। আসা- যাওয়া, জন্ম – মৃত্যু, সৃষ্টি – বিনাশ এইসব নিয়েই গঠিত এই সংসার। সংসার মানে সম্ + সার, অর্থাৎ সমান জীবন, এই সংসার এ সবাই সমান, বর্তমানে কর্মই ভবিষ্যত্এর জীবন যাপন নির্ধারণ করে, যে যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে।

সমস্ত জীবজগৎ বা সমস্ত জীবন যাতে প্রতিবাহিত হয় তার নামই সংসার। সংসার হলো সমুদ্রের মত এবং জীব হলো সমুদ্রের তরঙ্গের মতো, যেরূপ সমুদ্রের থেকে তরঙ্গের সৃষ্টি হয় আবার সমুদ্রের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায় সেইরূপ এই সংসারেই জীবের সৃষ্টি আবার এইখানেই বিনাশ।

বৌদ্ধধর্মে সংসারকে ভবচক্র বলা হয় থাকে। ভবচক্র অর্থাৎ ভবের চক্র, এই ভবের মধ্যে সংসার এর চক্রের মত ঘুরতে থাকে। সংসারকে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জানা যায়।

সংসার মানে কী

সংসার শব্দের অর্থ কি বললে এখানে বিভিন্ন ধর্মের পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে। সংসার মানে বিচরণ, যেখানে সমস্ত জীবজগৎ চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। পুরো বিশ্ববাসী ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে সংসারকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সংসার ভারতীয় ধর্মে একটি চিরন্তন মৌলিক ধারণা যা নিজ নিজ কর্মের মাধ্যমে পরিবর্তীত হয়।

“এই জন্মে ভালো কর্ম করলে পরবর্তী জন্মের ভালো ভাবে জীবন যাপন করতে পারবে” , এই ধারণা নিয়ে সমস্ত পৃথিবীবাসী সংসারিক কর্মে ব্যাস্ত। এই সংসারিক কর্মগুলোকে বৈদিক যুগের মুনি ঋষিরা চারটি ভাগে ভাগ করেছিলেন, এই ভাগগুলি হলো বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষ্ত্রিয় এবং ব্রাহ্মণ্য।
মোনিয়ার উইলিয়ামস এর মতে সংসার শব্দের মূল হলো সংসর যার অর্থ হলো ঘুরে বেড়ানো বা ঘোরাঘুরি করা।

এই সংসারেই সমস্ত জীবের জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম হয় এবং কোনো বাধা ছাড়াই এই বিশ্বে ঘোরে বেড়ানোর নামই সংসার। হিন্দুধর্মে সংসার হলো আত্মার ভ্রমণ। হিন্দু ধর্ম বলে যে দেহ মারা যায় কিন্তু আ‌ত্মা নয়। আ‌ত্মা দেহ বা রূপ পরিবর্তন করে এবং এটি চিরন্তন সত্য। হিন্দু ধর্ম এটাও বিশ্বাস করে যে আ‌ত্মা নামক এই চিরন্তন আত্মার কখনই পুনর্জন্ম লাভ করে না।

হিন্দুদের বিশ্বাস এটা পরিবর্তিত হয় না এবং কেউ এটা পরিবর্তন করতে পারে না। অন্যথায় শরীর, রূপ, কর্ম, পরিস্থিতি এইসব ক্রমাগত পরিবর্তন হয়, জন্ম এবং মৃত্যু হয়। সংসারের বর্তমানের কর্ম ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নির্ধারণ করে।

সংসারের ভালো কর্ম, ভালো অভিপ্রায়, ভবিষ্যতের মোক্ষ লাভ করতে সাহায্য করে।
জৈন ধর্মের মতে সংসার এবং কর্ম মতবাদ তাদের ধর্মের পরিচয় দেয়। জৈনরা প্রথম থেকেই কর্ম ও সংসার সম্পর্কে তাদের ধারণা প্রমাণিত এবং যুক্তিগত। জৈন ধর্মে সংসার জাগতিক জীবনকে প্রতিনিয়ত প্রতিনিধিত্ব করে যা প্রতিনিয়ত পুনর্জন্ম এবং অস্তিত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কষ্ট সহ্য করে।

জৈন ধর্মের ঐতিহ্য এবং অন্যান্য ভারতীয় ধর্মের মধ্যে জৈন ধর্মের সংসার মতবাদ এর ধারণা এবং যুক্তি আলাদা। যেমন জৈন ধর্মে আত্মা একটি চিরন্তন সত্য হিসেবে গৃহীত হয়, যেটি হিন্দু ধর্মেও মেনে নেওয়া হয় কিন্তু এটা বৌদ্ধ ধর্মে এটা মানা হয় না জৈন ধর্মে সংসার এর শুরু এবং শেষ আছে কিন্তু হিন্দু ধর্মে সংসার একটা চক্র যার শেষ নেই।

বৌদ্ধ ধর্মের মতে সংসার হলো জীবন, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের দ্বারা গঠিত দুঃখে ভরা এক চক্র, যেটির শুরু বা শেষ দুটিই অস্তিত্বহীন। এই অস্তিত্বের চক্র বা চক্রের থেকে মোক্ষ বা মুক্তি লাভই হলো বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য। বৌদ্ধ ধর্মে সংসারকে স্থায়ী বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের মতে কর্মই এই স্থায়ী সংসারকে চালিত করে।

বৌদ্ধ ধর্মের মতে পুনর্জন্ম তারই হয়, যার জ্ঞান অর্জন এর অভাব ছিল এবং সেই অভাবটুকু পূর্ণ করার জন্যই তার পুনর্জন্ম হয়, এই দুঃখ ভারী সংসারে। বৌদ্ধ ধর্মানুযায়ী এই দুঃখে ভরা সংসারের থেকে মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় হলো জ্ঞান অর্জন। এবং এই জ্ঞান অর্জনের জন্যই সংসারের পুনঃনির্মাণ বা পুনর্জন্ম হয়।

শিখধর্ম সংসার ধারণাকে কর্ম, কোল ও অস্তিত্বের চক্রীয় আকারে প্রকৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৫ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরুনানকের প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগুলোর চক্রিয় ধারণা এবং ৭ম শতাব্দীতে প্রথম দিকে ইসলামের রৈখিক ধারণার মধ্যে একটি পছন্দ ছিল এবং তিনি এই সংসারের মধ্যে সময়, স্থান এবং কর্মকে রেখে নিয়েছিলেন।

শিখধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যে সংসার ধারণার ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ প্রার্থক্য রয়েছে। প্রার্থক্য হলো শিখ ধর্ম দৃঢ় ভাবে ঈশ্বরের অনুগ্রহে বিশ্বাস করে কিন্তু হিন্দু ধর্ম কর্মে বিশ্বাস করে, হিন্দু ধর্ম বলে কর্মই ধর্ম, কর্মের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস।


সংসারে পুনর্জন্মের চক্রের ধারণার ঐতিহাসিক উৎপত্তি স্পষ্ট না কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ভারত ও প্রাচীন গ্রিস উভয় গ্রন্থেই সংসারের পুনর্জন্মের ধারণাটি দেখা যায়। সংসারে মতবাদ বা সংসারের ধারণা ঋকবেদ এর শেষ দিকের পাঠ্যে কর্ম এবং পুনর্জন্মের উল্লেখ রয়েছে এবং এতে কর্মফল এবং পুনর্জন্মের পূর্বাভাস রয়েছে।

আরও পড়ুন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com