শ্রবণ দক্ষতা কী? বিস্তারিত জানুন


শ্রবণ বা শোনার দক্ষতা হলো ভাষা ব্যাবহার, ভাষা শিক্ষার জন্য এক দক্ষতা। ভাষা ব্যাবহার, ভাষা শিক্ষার জন্য চারটি দক্ষতার বিশেষ প্রয়োজন। শ্রবণ দক্ষতা, কথন দক্ষতা, পঠন দক্ষতা ও লিখন দক্ষতা। এখানে আমরা শ্রবণ দক্ষতার প্রকৃতি, উৎস, সমস্যা এবং সমস্যাগুলোর সমাধানের উপায়ের বিষয়ে এবং কিভাবে শিক্ষাদান করলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপাঠে সন্তুষ্ট এবং মনোযোগী হবে, এই বিষয়ে আলোচনা করবো।

শ্রবণ দক্ষতার প্রকৃতি দুধরনের হতে পারে –
১/ একপাক্ষিক এবং ২/ দ্বিপাক্ষিক।
১/ একপাক্ষিক শ্রবণের ক্ষেত্রে কোনো উৎস থেকে বার্তা শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ একপাক্ষিক শ্রবণে আমরা শুধু শুনি কোনো উত্তর দেই না।
২/ দ্বিপাক্ষিক শ্রবণের ক্ষেত্রে উৎস থেকে বার্তা শ্রোতার কাছে যায় ও তার উত্তর প্রেরকের কাছে ফিরে আসে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কথা বার্তা হয়। অর্থাৎ কারো কাছে থেকে কোনো কথা শুনি এবং তাকে ফিরিয়ে উত্তর দেই।

একপাক্ষিক শ্রবণের উৎস:-
১) রেডিও, দূরদর্শন থেকে আগত শব্দ।
২) এয়ারপোর্ট, বাস টার্মিনাস, রেল স্টেশন প্রভৃতির কোনো ঘোষণা।
৩) টেলিফোন দপ্তরের রেকর্ড করা বক্তব্য।
৪) শ্রেণী কক্ষে শিক্ষকের বক্তৃতা।
৫) কোনো রাজনৈতিক নেতার টেপ করা ভাষণ।

দ্বিপাক্ষিক শ্রবণ এর উৎস:-
দ্বিপাক্ষিক শ্রবণে বক্তা ও শ্রোতা উভয়েই কথা বার্তার দ্বারা ভবের আদান প্রদান ঘটায়। এবং শ্রোতাকেও বক্তার অভিপ্রায় বুঝে উত্তর দিতে হয়

দ্বিপাক্ষিক শ্রবণে শ্রোতার ভূমিকা:- শ্রবণ প্রক্রিয়ায় শ্রোতাকে নিষ্ক্রিয় মনে হলেও তাকে অনেক বিষয়ে সক্রিয় হতে হয়। যেমন :-
১) প্রেরিত বার্তাটির অর্থ উপলব্ধি করতে হয়।
২) পূর্বজ্ঞান ও ভাষাগত পারামতাকে কাজে লাগিয়ে শ্রোতার বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করতে হয়।
৩) আগ্রহ ও মনোযোগ সহকারে বক্তব্যটি শুনতে হয়।
৪) শ্রোতার বক্তব্যের ভিত্তিতে উত্তরও দিতে হয়।
৫) খবরের ভিত্তিতে শ্রোতার প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হয়।

শ্রবণের ক্ষেত্রে সমস্যা ও সমাধানের উপায়:-

মূলত বলার আগে শুনা জরুরি। কারণ নির্ভুল ভাবে শুনার উপর সঠিকভাবে ভাষা বলটা নির্ভর করে। অর্থাৎ আমাদের বলতে গেলে কিন্তু আগে ভালো করে শুনতে হয়।শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষকের শিক্ষা কার্যক্রম, আলোচনা প্রভৃতি সঠিক ভাবে শুনতে না পায়, তবে তার পক্ষে কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষকের সমস্ত বক্তব্য শুনতে পায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তবে শোনার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেগুলি আলোচনা করা হচ্ছে:-


১) সচেতনতার অভাব:- শুনতে গেলে আমাদের মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। শিক্ষার্থীরা সচেতন না হলে শোনায় বাধা সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাই পঠনপাঠনের সময় যাতে সচেতন থাকা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।


২) ধৈর্যের অভাব :- আমাদের কিছু শুনতে গেলে কিন্তু ধৈর্য্য সহকারে বক্তব্যটি শুনতে হবে কারণ ধৈর্য্যের যদি অভাব দেখা দেয় তাহলে কিন্তু বক্তা যা বলছে তা আমরা ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পারবো না। তাই কোনো কিছু নতুন শিখতে হলে, জানতে হলে, ধৈর্য্য সহকারে শিক্ষ্কের কথা শুনতে হয়। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে মনোযোগের অভাব ঘটবে। তাই শিক্ষকের কথা ঠিকমতো শুনতে পাওয়া যাবে না।


৩) উচ্চারণের ত্রুটি :- সঠিক ভাবে উচ্চারণ না করলে যে শ্রোতা থাকবে সে কিন্তু ঠিক ভাবে বুঝতে পারবে না। অর্থাৎ শিক্ষকের উচ্চারণ স্পষ্ট না হলে শিক্ষার্থীরা তা অনুধাবন করতে পারবে না। তাই শিক্ষকের উচ্চারণ যথাযথ স্পষ্ট হওয়া উচিত। কারণ উচ্চারণে যদি কোনো ত্রুটি থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরাও কিন্তু ভুল শিখবে।


৪) নীরস পাঠ পরিবেশন :- যদি কোনো পাঠ নীরস হয়, অর্থাৎ রস থাকে না তাহলে শিক্ষার্থীরা তা ভালোভাবে বুঝতে পারবে না। শিক্ষকের পঠনপাঠন যদি সাবলীল, সহজ, সরল না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ শিক্ষকের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। শিক্ষকের পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে সরস, সহজ ও সাবলীল পাঠ দেওয়া সম্ভব নয়।


৫) মানসিক অস্থিরতা :- শিক্ষকে মানসিক ভাবে স্থির থাকতে হবে। শিক্ষকের কোনো কারণে মানসিকভাবে সুস্থির না থাকলে, তার শিক্ষনক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটবেই। বারবার তিনি অন্যমনস্ক হয়ে পড়বেন ও শিক্ষণকার্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আসবে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়বে। তারা ঠিকমতো ব্যাপারটাকে অনুধাবন করতে পারবে না।


৬) আকর্ষণধর্মিতার অভাব :- যেটা পাঠ দেবো সেটা যেনো আকর্ষণীয় হয়। আকর্ষণ ধর্মিতার যদি অভাব হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে মনোযোগ আসবে না। শিক্ষকের শিক্ষণে যদি শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট না হয় তবে তারা বিষয়বস্তু শুনতে আগ্রহ বোধ করবে না। ক্রমশ অমনোযোগী হয়ে পড়বে। তাই শিক্ষকের উচিত নানা রকমের শিক্ষামূলক উপকরণ সংগ্রহ করে বিষয়বস্তু ছাত্রদের কাছে উপস্থাপিত করা।


৭) সঠিকভাবে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা :-
শিক্ষকের কাজ হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিকভাবে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা। কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করিয়ে, বিতর্কসভায় বসিয়ে, কবিতা, ছড়া, আবৃত্তির আসরে অংশগ্রহণ করিয়ে ছাত্রদের সঠিক শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।


৮) শিক্ষকের অকারণ ক্রোধ প্রকাশ :- কোনো কারণে শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীর উপর অসন্তুষ্ট হলে তার রাগের উদ্রেক হয়। ওই বিষয় পরিবেশন যথাযথ হয় না, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বক্তব্য হৃদয়গম করতে পারে না অর্থাৎ বুঝতে পারে না। এতে শিক্ষার্থীরাই বিড়ম্বিত হয়। এ ব্যাপারে সাবধান থাকা জরুরি।


৯) শিক্ষকের হীনমন্যতা বোধ :- শ্রবণের ক্ষেত্রে হীনমন্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কারণে শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষার্থীর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন, তখন তিনি অসস্তি বোধ করেন। এবং শিক্ষার্থীর মনেও অসস্তি বোধ হয়। তাই এর থেকে যাতে শিক্ষকের মনে হীনমন্যতা ভাব জাগ্রত না হয় সেটা দেখতে হবে। এটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের পক্ষেই ক্ষতিকর। নিজেকে উপর আত্মবিশ্বাস রেখে পড়াতে হয়।

শ্রবণের ক্ষেত্রে দেখা দেওয়া সমস্যা গুলোর সমাধান

১। প্রতিলিপি অনুশীলন:- শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের পাঠ ঠিকমতো বুঝতে পেরেছে কি না, শিক্ষকের পাঠ শুনে সঠিক ভাবে লিখতে পেরেছে কি না, তা প্রতিলিপি অনুশীলনের মাধ্যমে সহজেই বুঝা যায়।


২। বিশুদ্ধ উচ্চারণ অনুশীলন:- পাঠ্যপুস্তকের কোনো অংশ বিশুদ্ধ উচ্চারণের মাধ্যমে পাঠ করে, শিক্ষার্থীদের দিয়ে ওই অংশ পাঠ করালে যদি তারা যথাযথ উচ্চারণে পাঠ করতে পারে তবেই বোঝা যাবে যে শিক্ষার্থীরা শোনার ব্যাপারে কতটা মনোযোগী ছিল।


৩। বিতর্ক অনুশীলন :- বিদ্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে একদিন করে বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজনর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শোনার অনুশীলন করা যায়। বিতর্ক সভা করলে তাদের মধ্যে শোনার দক্ষতা বাড়বে এবং যুক্তিশিল চিন্তা করার যে ক্ষমতা সেটাও বাড়বে।


৪। গল্পঃ, কাহানি ও আবৃত্তির মাধ্যমে পাঠদান :- সরস পাঠদানের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে গল্পঃ, কাহানির মতো যদি পড়ানো হয় তো সেক্ষেত্রে শিক্ষাদান খুব ভালো হবে।


৫। প্রশ্নোত্তর :- প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পড়ানোর সময় মাঝে মাঝে তাদের ছুটো ছুটো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, তারা শিক্ষকের পড়ানোতে মনোযোগ দেবে।


৬। শিক্ষকের বাচনভঙ্গি :- শিক্ষকের বাচনভঙ্গি যদি সুন্দর হয়, তবে ছাত্ররা স্বভাবতই অমনোযোগী হয় না। শিক্ষকরা বুঝানোর সময় যদি একটু ভঙ্গি করে, ছাত্রদের মনোরঞ্জন করেন তাহলে ছাত্ররা অবশ্যই শ্রবণে মনোযোগী হয়।


৭। শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার :- শিক্ষাদানকালে উপযুক্ত শিক্ষা সহায়ক উপকরণ প্রযুক্ত হলে ছাত্ররা পাঠে মনোযোগী হয়। অর্থাৎ কোনো একটা বিষয়ে আলোচনার সময় বা শিক্ষা দানের সময় সেই বিষয়ের কোনো বস্তু যদি সামনে থাকে বা সেটার যদি স্বাভাবিক উদাহরণ দেওয়া যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ হয়। যেমন: ধরো আপনি রেল গাড়ী বিষয়ে কিছু আলোচনা করছেন, তখন যদি একটা রেল গাড়ির ছবি বা খেলনা দিয়ে ছাত্রদের বুঝানো হয়, তাহলে তাদের পড়তেও মনোযোগ আসবে।


৮। শোনার পরিবেশ তৈরি :- শিক্ষকের পাঠদান ও সেই পাঠ শোনার জন্যে শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তবেই শিক্ষার্থীরদের মধ্যে শ্রবণ দক্ষতা বিকশিত হবে।

এই পোস্ট পড়ে আপনারা জানলেন শ্রবণ দক্ষতা কী এর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে। তাই এই বিষয়ে আরও জানার জন্য আমরা কোন এক নতুন আর্টিকেল নিয়ে আসবো। এছাড়াও আপনারা আমাদের পোর্টালের অন্যান্য শিক্ষণীয় পোস্টসমূহ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com