মন্দিরের শহর কাকে বলা হয়?


দেশ বিদেশে এত এত মন্দির থাকা সত্বেও, ভারতের একটি অন্যতম রাজ্য ওড়িশার ভুবনেশ্বরকে মন্দিরের শহর বলা হয়ে থাকে। ওড়িশাতে রয়েছে অসংখ্য পুরনো প্রাচীন মন্দির তথাপিও ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শহরে আজও প্রায় 700 এরও অধিক মন্দিরের অবস্থান রয়েছে। অতি আশ্চর্যময় স্থাপত্য, প্রনপন্ত শিল্প, সংগীত, নৃত্যকলা এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভারতের এক অন্যতম উজ্জ্বল রাজ্য, যেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মুনোমুগদ্ধকর। যেখানে অবস্থান করছে বিশ্বের বৃত্ততম হ্রদ, চিলকা হ্রদ। ভারতের প্রাচীন মন্দিরের শহর এবং প্রাচীন স্থাপত্যএর ভূমি ওড়িশা রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো এবং কোন মন্দিরের জন্য ও কেনো ওড়িশাকে মন্দিরের শহর বলা হয়, এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করবো।

মন্দিরের শহর কাকে বলা হয়

ওড়িশার ইতিহাস

ভারতের পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি অন্যতম রাজ্য হলো ওড়িশা। অবস্থান গত সীমা অনুযায়ী ওড়িশার উত্তর সীমান্তে রয়েছে ঝাড়খণ্ড, দক্ষিণে রয়েছে অন্দ্রপ্রদেশ রাজ্য, উত্তর পূর্বে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে বঙ্গপোসাগর এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে ছত্রিশগড় রাজ্য, আয়তনের দিক থেকে ভারতের নবম বৃতত্তম রাজ্য ওড়িশার মোট আয়তন ১৫৫৭০৭ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে প্রায় ৪.৮০ কোটি মানুষের বসবাস রয়েছে সেখানে। জনসংখ্যার দিক থেকে ওড়িশা ভারতের 11তম রাজ্য।

ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী হল ভুবনেশ্বর। এই রাজ্যে মোট ৩০টি প্রশাসনিক জেলা রয়েছে। ভুবনেশ্বর ওড়িশার এক অন্যতম শহর। ওড়িশা রাজ্যটি আগে কলিঙ্গ ও উৎকল নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া এই রাজ্যের নাম ইতিহাসের পাতায় বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। 2011 সালে এর নাম ওড়িশা থেকে উড়িষ্যা করা হয়েছে।

ওড়িশা ব্রিটিশ আমলে 1936 সালের 1স্ট এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এই জন্যে ওড়িশার প্রতিষ্টা দিবস প্রতি বছর 1স্ট এপ্রিল পালন করা হয়। ওড়িশা সেই রাজ্য যাকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে উৎকল্ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওড়িশার হিরাকোদ বাঁধ ভারতের দীর্ঘতম মানব সৃষ্ট বাঁধ, যার দর্গ প্রায় 56কিলোমিটার। এই বিষ্ময়কর বাঁধটিকে 1956 সালে নির্মাণ করা হয়েছিল, জার উপর দিয়ে একটি 21কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রাস্তা বানানো হয়েছে। ওড়িশার নৃত্য সারা বিশ্বে সমাদৃত এবং এখানকার লোক নৃত্য দেখতে এবং শিখতে বহু দুর দুরান্ত থেকে লোক আসে।

ওড়িশার প্রধান গুহা

উদয়গিরি ও খন্ডগিরি গুহা গুলি ওড়িশার বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি, যা ভুবনেশ্বর থেকে 6কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই গুলাগুলিকে জৈন সম্প্রদায়ের দ্বারা নির্মিত প্রাচীনতম গুহাগুলোর মধ্যে একটি বলা হয়। উদয়গিরি গুহা মানে সূর্যোদয়ের পাহাড় এবং খন্ডগিরি মানে ভাঙ্গা পাহাড়। উদয়গিরিতে 18টি এবং খন্ডগিরিতে 15টি গুহা রয়েছে, যার মধ্যে রানী গুহাটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

উড়িষ্যা রাজ্যের কম্বল এবং ইজ্ঞাত শাড়ি ভারতে খুবই জনপ্রিয়, যা মূলত তাত থেকে তৈরি করা হয়। এই রাজ্যের মহির্গঞ্জ নামের রাজ্যটি শিশুশ্রম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রয়েছে, এখানে শিশুদের থেকে কোনো রকমের কাজ করানো হয় না। হনুমানের সবচেয়ে বড় মূর্তি ওড়িশার পামপশে অবস্থিত, যেটি মূলত হনুমান পাটিকা নামেও পরিচিত রয়েছে।

ওড়িশার প্রধান উৎসব, নৃত্য, পোশাক এবং খাবার

ওড়িশার বেশ কিছু প্রধান উৎসবের মধ্যে রয়েছে, কলিঙ্গ উৎসব চন্দনযত্রা যা 21দিনের হয়। ঘনাক নৃত্য উৎসব এবং ভগবান জগন্নাথের যাত্রা যা জুন মাসে উদযাপিত হয়। ওড়িশার লোক নৃত্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্বলপুরী, ঝুমুর নৃত্য, রাসারকেলি, ডালখাই ইত্যাদি। এখানের প্রধান লোক নৃত্য হলো ওড়িশি এবং এই ওড়িশি নৃত্বটিকে প্রাচীনতম নৃত্য বলা হয়ে থাকে, যা প্রঞ্চতত্ব দ্বারা প্রমাণিত।


সম্বলপুরি শাড়ি এবং কাটাকি শাড়ি ওড়িশা রাজ্যের বিখ্যাত পোশাক এবং পুরুষদের বিখ্যাত পোশাকের মধ্যে রয়েছে ধুতি, সম্বল পুরি কুর্তা এবং শেরওয়ানি। ওড়িশার প্রধান খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে ডালমা, ছিনা পড়া, পাখালা ভাত, পিলাফ ইত্যাদি।


ওড়িশা তার ঐতিহাসিক স্থাপত্য শিল্প এবং দর্শনীয় দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। ওড়িশার সমুদ্র সৈকত, পুরীর জগন্নাথ মন্দির, কনার্কো সূর্য মন্দির এবং ভুবনেশ্বর এর লিঙ্গ রাজ মন্দির পর্যটক কারীদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় স্থান। যেখানে প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক কারীদের ভির জমে।

কেনো এবং কোন মন্দিরের জন্যে ভুবনেশ্বরকে মন্দিরের শহর বলা হয়ে থাকে?

ওড়িশার প্রধান প্রধান মন্দির গুলোর মধ্যে রয়েছে, জগন্নাথ মন্দির যা পুরীতে অবস্থিত। তার পর রয়েছে কোণার্ক সূর্য মন্দির যাকে কালো মন্দির নামেও জানা যায়। তারপর রয়েছে ওড়িশার বালেশ্বরএ অবস্থিত চন্দনেশ্বর মন্দির।ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শহরে আজও এখানে ওখানে প্রায় 700 এর অধিক প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন মন্দির হলো লিঙ্গরাজ মন্দির। মন্দিরটি শিব এবং বিষ্ণুর মিলিত রূপ হরি হরের নামে উৎসর্গীকৃত।

মন্দিরটি ভুবনেশ্বরএর ভূ স্থাপনা এবং প্রধান পর্যটন স্থান। লিঙ্গরাজ মন্দির ভুবনেশ্বর এর সবচেয়ে বড় মন্দির। এই মন্দিরের কেন্দ্রীয় চূড়াটি 180 ফুট উচু। মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্য কলা এবং মধ্যযুগীয় ভুবনেশ্বর স্থাপত্য শৈল দ্বারা নির্মিত। ধারণা করা হয়ে থাকে মন্দিরটি সৌম বংশীয় রাজত্ব কালে নির্মিত যা পরবর্তীতে গঙ্গা শাসকদের হতে বিকশিত হয় । ভুবনেশ্বরকে একামরা ক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে। 13শতকে লিখা, সংস্কৃত পুঁথি একাম্রা পুরান অনুযায়ী লিঙ্গ রাজের মন্দিরটি একটি আমগাছের নিচে অবস্থিত ছিল।


শিব রাত্রি উৎসব এখানকার প্রধান উৎসব। লিঙ্গ রাজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো লিঙ্গের রাজা, যা হিন্ধুমতে শিবের প্রতিরূপ। আদিতে শিবকে কৃতিবাস এবং পরে হরিহর হিসেবে পূজা করা হতো। যাকে ত্রিভুবনেরশ্বরও বলা হয়, যার অর্থ তিনটি ভুবন অর্থাৎ স্বর্গ, মত্য ও শূন্য লোকের অধিপতি। যার সঙ্গিনীকে বলা হয় ভুবনেশ্বরী।

11দশকের শেষ শতক থেকে মন্দিরটি টিকে আছে। ষষ্ট শতকে মন্দিরটি নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ সপ্তম শতকের কিছু সংস্কৃত পুঁথিতে মন্দিরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শহরের এই লিঙ্গ রাজ মন্দিরের জন্যে সাধারণ এই শহরকে মন্দিরের শহর বলা হয়ে থাকে।


আশা করি মন্দিদের শহর কাকে বলা হয় এবিষয়ে কিছু ধারণা দিতে পেরেছি। এরকম আরও নতুন নতুন তথ্য সম্পর্কে জানতে হলে, আমাদের পোর্টালের আরও আর্টিকেল পড়ুন। (এখানে ক্লিক করুন)


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com