আমার শহর কলকাতা- বিষদ রচনা



ভারতের অন্যতম এক শহর কলকাতা যাকে ‘sity of joy‘ বলা হয়ে থাকে। মিশ্র ভাষা এবং মিশ্র সংস্কৃতির অন্যতম এক শহর হলো কলকাতা। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এক বৃহৎ শহর হিসাবে অধিষ্ঠিত এই কলকাতা।

ব্রিটিশ শাসন কালে কেলকাতা ভারতের রাজধানী ছিল বলে, সেখানে ব্রিটিশদের তৈরি অনেক নিদর্শন রয়েছে। 2001 সালে কেলকাতা শহরের নাম পরিবর্তিত হয়ে কলকাতা রাখা হয়। যে শহর মিশ্র ভাষা, মিশ্র সংস্কৃতি এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এবং বইপ্রেমী ও ক্রীড়া অনুরাগী হয়ে উঠতে পেরেছে, আজ সেই শহর এর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

কলকাতা নামের অর্থ এবং উৎস

কলকাতা ভারতের অন্যতম প্রাচীন একটি শহর, যেটি পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী। কলকাতা পূর্ব ভারতের রাজনীতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কেন্দ্র ছিল । জনসংখ্যার দিক দিয়ে কলকাতা নিউ দিল্লি এবং মুম্বাই এর পরে তৃতীয় বৃহত্তম শহর। বঙ্গপোসাগর থেকে 1038 কিলোমিটার উত্তর দিকে, ভাগীরতি নদীর পূর্ব পাশে অবস্থিত এই কলকাতা।

কলকাতা নামের উৎপত্তি নিয়ে নানাবিদ গল্পঃ বা মতামত রয়েছে। কলকাতা শহর তৎকালীন তিনটি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত হয়, এই গ্রামগুলি ছিল কলিকাতা(গ্রাম), সুতানুটি ও গোবিন্দপুর। কলিকাতা শব্দের উৎস নিয়ে কয়েকটি মতবাদ রয়েছে। একমতে কালী ক্ষেত্র, আরেকমতে কালী ঘাটের থেকে, কেও বলছে কিলকিলা থেকে না কি কলিকাতা শব্দের উৎপত্তি।

আসলে কলিকাতা একটি খাঁটি বাংলা শব্দ যার অর্থ কলি বা কলি চুনের জন্যে কাতা। 300 বছরেরও অধিক পুরনো আমাদের এই প্রিয় কলকাতা শহর 1690 খ্রিস্টাব্দে, জব চার্স সুতানতি, গোবিন্দপুর ও কলিকেতাকে কেন্দ্র করে কলকাতা নগরীর পতন করেছিলেন। 1772 সালে মুর্শিদাবাদ শহর থেকে বাংলার রাজধানী কলকাতার স্থানানস্তরিত করা হয়েছিল।

1911 সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ভারতের সমগ্র ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলের রাজধানী। কথায় আছে যে তখনকার ব্রিটিশ শাসিত এলাকার মধ্যে লন্ডনের পরেরই কলিকাতাকে বৃহত্তম নগরী হিসেবে গণ্য করা হতো। 1923 সালে মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট এর অধীনে কলকাতা পৌর সংস্থায় স্থাপিত হয়। ঐকনিবেশিক শাসন কালে কলকাতার ব্রিটিশদের দেওয়া নাম ছিল কেলকাটা।

পরবর্তীতে নব গঠিত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা করা হয়। 2001 সালে এই শহরের নাম সরকারি ভাবে পরিবর্তন করে নাম বাংলায় কলকাতা এবং ইংরেজিতে kolkata করা হয়, যা এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান নগর হিসাবে উল্লেখিত।

কলকাতার ঐতিহ্য

আমাদের কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রাথমিক ভাষা হলো বাংলা, ইংরেজিও ব্যাপক ভাবে ব্যাবহৃত হয় এখানে, বিশেষ করে ব্যাবসায়িক কাজে এবং শিক্ষায়। কলকাতা শহরটি যেমন তার আধুনিকতাকে ধরে রেখেছে তেমন তার ঘন অতীতকেও ভুলে যায়নি। শহরটি যেমন তার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত তেমনি প্রেসিডেন্সি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কিছু মর্যাদাসম্পূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যে বহির্দেশেও পরিচিত।

সাহিত্যের দিগ দিয়েও পশ্চিম বঙ্গের এই শহরটি বেশ এগিয়ে, বহু বিখ্যাত লেখক এবং কবির নাম এই শহরে সাথে যুক্ত। এই বরণ্য ব্যাক্তিদের মধ্যে প্রথমেই থাকবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একাধারে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, চিত্র শিল্পী এই ব্যাক্তিত্ব, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রথম এশীয় এবং কলকাতা শহর এর বাসিন্ধা।


থ্রিয়েটার, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং নৃত্য সহ প্রানবন্ত শিল্প দৃশ্যের কারণে কলকাতাকে প্রায়শই ‘ ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী ‘ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এটি কলকাতার আন্তজার্তিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং দুর্গা পূজা উৎসবের মত বিখ্যাত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর আবাসস্থল। যা শহরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে পালিত উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম।

কলকাতার বিখ্যাত খাবার

কলকাতা শহরটি তার সুস্বাদু স্টেট ফুড এর জন্যে বিখ্যাত। এই শহরের বিখ্যাত স্ট্রেট ফুড এর সংস্করণ হলো ‘ ফুচকা ‘ অঞ্চল বেধে এই খাবারটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গে এই খাবারটি ফুচকা হিসাবে পরিচিত হলেও, উত্তর ভারতে এটি ‘ গোলগাপ্পা ‘ এবং মহারাষ্ট্রে এটি ‘ পানিপুরি ‘ নামে পরিচিত।

কলকাতা এবং ভারতের আরও অনেক জায়গায় মাটির কাপে চা পরিবেশনের একটি ঐতিহ্য রয়েছে যা স্থানীয় ভাবে ‘ কুলাহার ‘ বা ‘ ভার ‘ নামে পরিচিত। মাটির কাপে চা শুধু পানীয় নয় এটি সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্যেও সম্পর্কিত। চায়ের আড্ডা নামে, চায়ের স্টলে লোকজন জমা হয় আড্ডা দিতে এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। এটি সামাজিকিকরন এবং ধারণা বিনিময় করার একটি উন্মুক্ত জায়গা।

ভোজন রসিক কলকাতা বাসি পেটপুরে আহারের পর যে জিনিসটা পছন্দ করে সেটি হলো ফুটবল। বলা হয় ফুটবল বাঙালির রন্ধে রন্ধে মিশে আছে, তারা যদি আর কোনো দলের খেলা নাও দেখে থাকেন কিন্তু ইস্ট বেঙ্গল এবং মোহন বাগানের ম্যাচগুলো কোনো ভাবেই বাদ দেন না। ইস্ট বেঙ্গল এবং মোহন বাগান উপ মহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব। এদের মধ্যেকার ম্যাচকে। ‘ দ্যা গ্রেট ক্যালকাটা ডার্বি ‘ বলা হয়।

কলকাতার বিখ্যাত পর্যটন স্থান

কলকাতা কিন্তু ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ একটি স্থান। রবীন্দ্র নাথের পদোধন্য এই শহরকে পর্যটন আকর্ষণের একটি অপূর্ব লীলা ভূমি বললেও ভুল হবে না কোনো ভাবেই। কলকাতার দর্শনীয় স্থানগুলির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ‘ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ‘ এর নাম। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভারতের কলকাতায় অবস্থিত একটি আইকনিক স্থিতিস্তম্ভ। এটি একটি বিশাল সাদা মার্বেল ভবন যা রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছিল।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর ভিতরে একটি যাদু ঘর রয়েছে যেখানে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগের শিল্প চিত্র এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলির একটি বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর পর দ্বিতীয় যে দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেটি হলো হাওড়া ব্রিজ। এই ব্রিজটি আনুষ্ঠানিক ভাবে রবীন্দ্র সেতু নামেও পরিচিত।

হাওড়া ব্রিজ হুগলি নদীর উপর অবস্থিত যা কলকাতা ও হাওড়া শহরকে সংযুক্ত করেছে। ব্রিজটি কেবল পরিকাঠামোর একটি অংশ নয়, বরং এটি কলকাতার স্থিতি স্থাপকতা, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক তাৎপর্যেরও প্রতীক।

এছাড়াও কলকাতার আরো একটি বড় ঐতিহ্য জোড়ে রয়েছে জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। জোড়া সাঁকো কলকাতার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। এই অঞ্চলে অবস্থিত ঠাকুর পরিবারের প্রত্যেক বাড়ি যা জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ি নামে পরিচিত।

বর্তমানে এটি একটি যাদুঘর এবং একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষক স্থান। যা দর্শনার্থীদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও তাঁর ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র, পাণ্ডু লিপি, চিত্র কর্ম এবং আরও অনেক কিছু প্রদর্শন করে।

কলকাতা বেড়াতে আসলে দর্শকরা পার্ক স্ট্রিট এ বেড়াতে আসবেন না এমন হতেই পারে না। এই পার্কটিকে প্রায়শই সাহেবের পাড়া বা ইংরেজদের প্রতিবেশী বলা হয়ে থাকে। পার্ক স্ট্রিট কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রানবন্ত রাস্তার মধ্যে একটি। সাম্প্রতিক কালে পৌর সংস্থা মাদার তেরেসার নাম অনুযায়ী এই রাস্তার নাম করণ করা হয় মাদার তেরেসা স্বরণি। যদিও পুরনো পার্ক স্ট্রিট নামটি বহুল পরিচিত।

তবে আমোদ প্রমোদের বাহিরে গ্রন্থপ্রেমী পর্যটক দের গন্তব্য কিন্তু ভিন্ন। কলেজ স্ট্রিট বই পারা বা বুক স্ট্রিট নামে পরিচিত। এটি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে গুরত্ব পূর্ণ রাস্তা।

এটি সাহিত্যিক ঐতিহ্য, অসংখ্যক বইয়ের দোকান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রানবন্ত পরিবেশের জন্য বিখ্যাত। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ‘ মান্না দের ‘ গাওয়া ‘ কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ‘ এই গানটি কফি হাউস কিন্তু কলেজ স্ট্রিট-এই রয়েছে।

কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতের অন্যতম বিখ্যাত কালী মন্দির। এই মন্দিরটি শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় 20 কিলোমিটার উত্তরে হুগলি নদী পূর্ব তীরে অবস্থিত। দেবী কালীকে উৎসর্গ করার একটি উল্লেখযোগ্য তীর্থ স্থান এবং একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষক। মন্দিরটি 19 শতকের মাঝমাঝি সময়ে একজন ধর্ম প্রাণ এবং পরোপকারী বিধবা রানী রাসমণি কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এমনকি এই মন্দিরটির নকশা করেছিলেন রানী রাসমণি নিজেই।

আশা করি আমার শহর কলকাতা এর বিষয়ে বিস্তারিত অনেক অজানা তথ্য জানতে পেরেছেন। এররকম আরও অজানা তথ্য জানতে হলে আমাদের পোর্টালে নিয়মিত আর্টিকেল পড়ুন। (ক্লিক করুন)


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com