আগ্রা শহরের প্রতিষ্ঠাতা কে?


আগ্রা, ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একটি ঐতিহাসিক শহর। এক সময় মোগল সাম্রাজ্যের অংশ থাকা শহরটি বর্তমানে তাজমহলের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। অসাধারণ সব স্থাপত্য আর রন্ধন শিল্প দ্বারা মোগলরা শহরটিকে অমর করে দিয়েছে। আজকে আমরা আগ্রা সম্পর্কে নানা জানা অজানা তথ্য ( আগ্রা শহরের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য এবং মোগলদের বিখ্যাত স্থাপত্য কীর্তি) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

আগ্রার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

যমুনা নদীর পূর্ব দিকে গড়ে উটেছিল প্রাচীন আগ্রা শহর। লোদী রাজবংশের সবচেয়ে সফল শাসক সুলতান সিকান্ত লোদী তার শাসন কালে 1504 সালে আগ্রাকে রাজধানী হিসেবে তৈরি করেন, ফলে তার শাসন আমলে রাজ কর্মচারী, ব্যাবসায়ী, শিল্পী ও জ্ঞানী ব্যাক্তিরা একত্রিত হন এই শহরে।

সুলতান শ্রীকান্তা লোদীর পুত্র, ইব্রাহিম লোদিকে পানি পথের যুদ্ধে পরাজিত করার পর, উপ মহাদেশীয় মোগল সাম্রাজ্যের সূচনা করেন সম্রাট বাবর। তবে আগ্রা নতুন ভাবে সেজে ওঠে সম্রাট আকবরের সময়ে।

এই সম্রাট তার শাসন আমলে যমুনা নদীর পাশে গড়ে তুলেন নতুন শহর আগ্রা। আগ্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে মোগলদের শিক্ষা, শিল্প, ব্যাবসা ও ধর্মীয় ভাবধারা। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগে আগ্রা একটি প্রসিদ্ধ শহর হিসেবে পরিচিত হয়।

আগ্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেন সম্রাট শাহজাহান। তার পুত্র সম্রাট ওরঙ্গজেব তার রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় 200বছর পর্যন্ত আগ্রা ছিল মোগলদের রাজধানী। ফলে মোগলদের কিছু স্থাপত্য দেখা যায় আগ্রা শহর জুড়ে।

আগ্রার বিখ্যাত স্থাপত্য কীর্তি

এই শহরে রয়েছে মোগল স্থাপত্য এর সেরা কীর্তি বিশ্ব বিখ্যাত তাজমহল । বলা হয় পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। যারা তাজমহল দেখেনি আর আরেক ধরনের মানুষ যারা তাজমহল দেখেছেন। তাহলে আপনি কোন ধরনের মধ্যে রয়েছেন? এমনি অপরূপ তাজমহলের সৌন্দর্য যে, তা বিশ্বের 7টি বিস্ময়কর স্থাপত্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে অনায়াসে।

সম্রাট শাহজাহান এবং মমতাজের কবর স্থান

সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে নির্মাণ করেন এই অমর কীর্তি। এটি নির্মিত হতে সময় লেগেছিল প্রায় 22বছর এবং এটি নির্মাণে প্রায় 20হাজার শ্রমিক ছিলেন। পৃথিবীর মূল্যবান সব স্থান থেকে পাথর, রত্ন এবং শিল্পীদের দ্বারা তৈরী নানা কারুকর্য দিয়ে নির্মিত হয় তাজমহল। সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসেন এই আগ্রার তাজমহলের সৌন্দর্য দেখতে। প্রতিবছর প্রায় 70 থেকে 80 লাখ পর্যটক তাজমহল দর্শন করেন।
তাজমহল থেকে একটু দূরে যমুনা নদীর পাশে আছে মহাতাপবাগ নামের এক অপূর্ব সুন্দর বাগান। মোগল সম্রাটরা বাগান পছন্দ করতেন, এটা তাদের সুরুচির পরিচয় বাহক। মহাতপবাগ চারকোনা আকৃতির বাগান, যেখানে রয়েছে অসংখ্য রঙ বেরঙের ফুলেন সমারহ। এই বাগান থেকে দেখা যায় অসাধারণ সুন্দর্যের তাজমহল।

বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য তাজমহল এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

5জানুয়ারি 1592 সালে জন্ম নেওয়া পঞ্চম মোগল সম্রাট শাহজাহান 1666 সালের 22জানুয়ারি পরলোক গমন করেন। তিনি 1628 সালে ভারত উপ মহাদেশ শাসন করতে শুরু করেন। আর তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় 1632 সালে। এটি তৈরি করতে 22হাজার শ্রমিকের 22 বছর সময় লেগেছিল। কথিত আছে স্ত্রী মমতাজ মহলএর সমাধির কাজ শাহজাহান আরম্ভ করলেও তার ছেলে ঔরঙ্গজেব তাকে আগ্রার দুর্গে বন্দী করে রাখায় সেই কাজ আর তিনি শেষ করতে পারেননি।


তাজমহল নির্মাণের মূল নকশা তৈরি করেন ওস্তাদ আহমেদ লাহোরি। সেসময় বেশির ভাগ মহল দালানি তৈরি হতো লাল বালু ও পাথর দিয়ে। কিন্তু তাজমহল নির্মাণে শাজাহান প্রথম শ্বেত পাথর ব্যাবহার করেন। তাজমহল নির্মাণের জায়গাটি ছিল মহারাজা জয় সিংহের সম্পতি। সম্রাট শাহজাহান এই জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

তাজমহল নির্মাণের জন্য শ্বেত পাথর আনা হয়েছিল রাজস্থানের থেকে। এছাড়া পাঞ্জাব থেকে আসে পান্না, চীন থেকে স্ফোটিক, তিব্বত, আফগানিস্থান এবং শ্রীলঙ্কা থেকে আনা হয় নানা ধরনের নীলকান্ত মণি। শ্বেত পাথরের গায়ে বসানোর জন্যে মোট 28ধরনের দুষ্প্রাপ্য দামী পাথর পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা হয়। তাজমহল নির্মাণের জন্য ভারতের বিশেষজ্ঞ ছাড়াও, পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তের স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদেরও আনা হয়েছিল।

তাজমহল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও এর মধ্যে অন্যান্য ধর্মের ছুয়াও দেখা যায়। যেমন: চারটি মিনার মুসুলমানদের মসজিদের মতো হলেও তাজের মাথার ত্রিশূলটি হিন্দুদের শিব মন্দিরএর অনুকরনে নির্মিত। দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোর সাথে তাজমহলও বিভিন্ন রং ধারণ করে। সকালে গোলাপি বর্ণের, দুপুরে হালকা হলুদ, বিকালে দুধের মতো সাদা। তাজমহল নির্মাণে কোনো লোহার কাঠামো ব্যাবহার করা হয়নি, এটি সম্পূর্ণ পাথরে নির্মিত। তাজমহলের উচ্চতা 240 ফুট যা দিল্লিতে অবস্থিত কুতুবমিনারের সমান।

মির্জা গিয়াস বেগ এবং তার স্ত্রীর কবর

তাজমহল যেমন রয়েছে সম্রাট শাহজাহান এবং তার স্ত্রী মমতাজ মহল এর কবর তেমনি মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি মির্জা গিয়াস বেগ ও তার স্ত্রীর কবর রয়েছে ইতিমাতুত দ্দৌলার টোম্পে। জুয়েলারী বক্সের মতো আকৃতির এই স্থাপত্য থেকে তাজমহল অনুপ্রাণিত করে মনে করা হয়, তাই এর নাম বেবি তাজমহল। লাল বেলে পাথর ও মার্বেল কাঠামোর প্রতিটি কোণে 13 মিটার উঁচু মিনার রয়েছে। সূক্ষ্ম জ্যামিতির নকশার বিভিন্ন কারু কার্য দেখতে পাওয়া যায় দৃষ্টি নন্দন এই কাঠামোতে। যে সময় সম্রাট আগ্রাকে পুরো বিশ্বে সুপরিচিত করেছিলেন, সেই শাসক আকবরের সমাধি স্থলও আছে আগ্রাতে। মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত শাসক চির নিদ্রায় শায়িত আছেন আগ্রার মুরান্টা গ্রামে। এখানে সম্রাট আকবরের দুই কন্যারও সমাধি রয়েছে। বেলে পাথর ও মার্বেল পাথরের তৈরি এই সমাধি স্থলেও রয়েছে আরেকটি বাগান। যেখানে হরিণ, বানর ও ময়ূর ঘুরে বেড়ায়।

আকবরের শাসন ঘর: আগ্রা ফোর্ট

তবে সম্রাট আকবর যেখান থেকে শাসন কাজ পরিচালনা করতেন সেটির নাম আগ্রা ফোর্ট। বিশাল এই দূর্গকে পরিভ্রমণ করতে সারা দিন লেগে যায়, এটি যেনো শহরের ভিতরে আরেক শহর। এর মধ্যে সব থেকে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে জাহাঙ্গীর মহল। মধ্য এশিয়ার স্থাপত্য রীতির সাথে প্রাচীন হিন্দু রীতির মিশ্রণ এটিকে অসাধারণ স্থাপত্যে পরিণত করেছে। কেল্লার ভিতরে আরো রয়েছে আঙ্গুরিবাগ, যা এক জল প্রবাহের পাশে এক সুন্দর উঠান।

আগ্রার সবচাইতে বড় মসজিদ

আগ্রা ফোর্ট এর উল্টো পাশে রয়েছে জমা মসজিদ, এটি আগ্রা শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদ। আকর্ষণীয় লাল বেলে পাথরের কাঠামোটি একটি প্লট ফ্রমের উপরে দাড়িয়ে আছে। এবং নীলচে রঙের ছাদ এবং দেওয়ালে রয়েছে অসাধারন মার্বেল পাথরের কারুকাজ। 17শতকে সম্রাট শাহজাহানের দ্বারা নির্মিত এই মসজিদে এখনো মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।

সম্রাট শাহজাহান এর প্রধান মন্ত্রীর সমাধি স্থল

সম্রাট শাহজাহান এর প্রধান মন্ত্রী আফজার খান সিরাজ উদ-দৌল্লা -র সমাধি স্থাপত্য মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। চিনিকা রওযা নামে পরিচিত এই স্থাপত্যটি অন্যান্য মোগল স্থাপত্যের মত সংরক্ষিত নয় যদিও তবুও ইন্দো পার্সিয়ান কাঠামোটি হলুদ, সবুজ এবং কমলা রঙের ষ্টাইল দিয়ে তৈরি, যা এখনও তার সৌন্দর্যকে ধরে রেখেছে। এই ষ্টাইলগুলো চীন থেকে আমদানি করা হয়েছিল বলে এর নাম ‘ চিনিকা রওযা।’

আগ্রা শহরের বিখ্যাত খাবার

কেবল স্থাপত্যেই নয়, আগ্রার খাবারেও রয়েছে মোগলদের প্রভাব লক্ষণীয়। সম্রাট আকবরের আমলে মোগল রান্না ঘরে প্রায় চারশো জন বাবরঝি নিযুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন রাজস্থানী। সেসময় থেকে রাজস্থানী খাবার এবং পার্সিয়ান খাবারের খরণা মিশ্রিত হয়ে, এক নতুন খরণার তৈরি হয় যা মোগল খরনা নামে বিখ্যাত।

আশা করি আপনি আগ্রা শহরের প্রতিষ্ঠাতা কে আগ্রা শহরের ইতিহাস এবং মোগলদের বিখ্যাত স্থাপত্য কীর্তি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য সম্পর্কে জানা অজানা অনেক নতুন তথ্য জানতে পেড়েছেন। এরকম আরও নতুন নতুন অজানা তথ্য সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের পোর্টালের আরও আর্টিকেল পড়ুন। (ক্লিক করুন)


WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com